ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে পণ্য আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি আঞ্চলটিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিষয়টির প্রতিক্রিয়ায় তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছেন অঞ্চলটির নেতারা। একই সঙ্গে শঙ্কা দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারেও। যদিও গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে স্বস্তি দেয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে আবারো তা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার জোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি বাস্তবে পরিণত হলে জার্মান গাড়ি, ফরাসি পারফিউম, ইতালির অলিভ অয়েল ও ওষুধসহ ইউরোপীয় পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। ইইউর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপের রফতানির আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি ইউরো, যার বড় অংশ এসেছে জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও ইতালি থেকে। হুমকি অনুযায়ী ট্রাম্প ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে তা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটিতে ইউরোপের এ রফতারি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নতুন করে শুল্ক হুমকির কারণ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য হলো ‘ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা যথেষ্ট দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে না। তাছাড়া ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিচার করছে, বিশেষ করে গাড়ি রফতানির ক্ষেত্রে। এখন সময় হয়েছে আমি যেভাবে খেলা খেলতে জানি, সেভাবে খেলা শুরু করার।’
এতেও থেমে থাকেননি ট্রাম্প। তিনি অ্যাপলকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন না করে, তাহলে আইফোনসহ অন্যান্য স্মার্টফোনে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। পরে তিনি স্যামসাংসহ সব বিদেশী সেলফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে জানান, এ শুল্ক তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন না করে।
ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর ইউরোপীয় নেতারা কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ইউরোপিয়ান কমিশনের বাণিজ্য প্রধান মারোস সেফকোভিচ বলেন, ‘ইউরোপ চায় আলোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতা, তবে হুমকির ভিত্তিতে নয়।’ তিনি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ও বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘আমরা আমাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত আছি।’
ডাচ প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কুফ বলেন, ‘আমরা আগেও দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় শুল্ক কখনো বাড়ে, কখনো কমে। আমরা এটিকে আলোচনা কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখছি।’
ফরাসি বাণিজ্যমন্ত্রী লরেন্ট সেইন্ট-মার্টিন বলেন, ‘এ ধরনের হুমকি আলোচনাকে সহায়তা করে না। তবে আমরা শান্তির পক্ষে আছি, আবার প্রয়োজনে প্রতিক্রিয়া জানাতেও প্রস্তুত।’
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখনো একই—জিরো-ফর-জিরো ট্যারিফ, যাতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়।’
সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হওয়ায় গতকাল মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ ছিল। এর আগে শুক্রবার ট্রাম্পের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ওইদিন ডাও জোন্স সূচক ২৫৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৪১,৬০৩ পয়েন্টে। একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৩৯ পয়েন্ট ও নাসডাক ১৮৮ পয়েন্ট হারায়। পুরো সপ্তাহজুড়ে তিনটি প্রধান সূচকই ২ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে।
অ্যাপলের শেয়ারদর ৩ শতাংশ কমেছে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া অ্যামাজন, এনভিডিয়া ও মেটা প্লাটফর্মসের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারও ১ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
বাজার বিশ্লেষক জেমস সেন্ট অবিন বলেন, ‘এখন খবরের শিরোনাম হওয়া উচিত—‘আবার শুরু হলো!’ সবাই ভাবছিল ট্যারিফ যুদ্ধ হয়তো শেষের পথে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সে আগুন এখনো নেভেনি।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প বিভিন্ন কোম্পানিকে চাপ দিচ্ছেন যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্য তৈরি করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্মার্টফোন তৈরি করার মতো প্রস্তুত না। তাই এ শুল্ক বাস্তবায়ন হলে স্মার্টফোনের দাম কয়েকশ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের এ ঘোষণা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময়ে এমন উত্তেজনা ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘ট্রাম্প মনে করেন ইউরোপ যথেষ্ট ভালো প্রস্তাব দিচ্ছে না। তাই এ হুমকির মাধ্যমে তিনি ইউরোপের ওপর চাপ বাড়াতে চান।’
বর্তমানে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলছে, যা জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত চলতে পারে। ৮ জুলাই শেষ হবে ট্রাম্প ঘোষিত ৯০ দিনের শুল্ক বিরতির সময়সীমা। তখন ১০ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হতে পারে। এর বাইরে ইউরোপের স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আগেই বসানো হয়েছে।